করোনা সংক্রমণের চতুর্থ মাস - উচ্চ সংক্রমণের আশঙ্কা এবং আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা

এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কার মাঝে সারা দুনিয়ার মানুষেরা আজ দুরতম সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে দিন গুনছে । আর সেই সম্ভাবনাকে সত্যি করে তুলবার প্রতিশ্রুতিতে দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন এই গ্রহের সেরা বিজ্ঞানীরা । তারা সফল হবেন নিশ্চিত, পৃথিবী আবার স্বাভাবিক হবে । কিন্তু সেই সফলতার বিন্দুটিতে পৌছাতে লাগবে বেশ কিছু সময়। সেই সময়টুকুতে নিজেদের নাগরিকদের সুস্থ রাখবার জন্য সামাজিক দূরত্ব আর লকডাউন কে অপরিহার্য ঘোষণা করেছে রাষ্ট্রগুলি । এই গৃহবন্দীত্বের বড় মাশুল গুনতে বিপর্যস্ত অর্থনীতি – রাষ্ট্রনীতি । কিন্তু নাগরিকরা বেচে থাকলে ঘুরে দাঁড়ানো যাবে আবার একসাথে – এই মন্ত্রেই বোধকরি দেশগুলি একাট্টা ।

একই বাস্তবতায় বাংলাদেশও অভিন্ন নয় । মার্চের প্রথম সঙ্ক্রমণের পর তিন মাস পেরিয়ে বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে সঙ্ক্রমণ সংক্রান্ত সবগুলি মেট্রিক উর্ধগামী । শুধু উর্ধমুখী তাই নয়, পার্শ্ববর্তী দেশগুলির তুলনায় শতকরা হিসেবেও আশঙ্কা জাগানোর জন্য যথেষ্ট। জুনের ৭ তারিখ পর্যন্ত কেবল সরকারি তথ্য অনুযায়ীই আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৬৫ হাজারের বেশি এবং মৃতের সংখ্যা হাজার ছুই ছুই (৮৮৮)। দৈনিক করা অতি অপ্রতুল টেস্টের মধ্যে গত কয়েক সপ্তাহে পাওয়া যাচ্ছে ২০ শতাংশের বেশি আক্রান্ত মানুষ – যা দক্ষিন এশিয়ায় এখন সর্বোচ্চ । এবং এটি চলতি মাসের শুরুতে কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবে অফিস আদালত খুলে দেবার আগের চিত্র, ওপেনিং এর প্রভাব বুঝতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরো এক-দুই সপ্তাহ । কিন্তু যদি এভাবেও চলত, তাহলেও কি আমরা প্রস্তুত ছিলাম আসন্ন দুর্যোগের জন্য ?

সরকারি হিসেবে পাওয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে মডেলিং করলে দেখা যায় যে জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহ নাগাদ বাংলাদেশে মোট সঙ্ক্রমণের সংখ্যা ১ লক্ষ ছাড়িয়ে যেতে পারে । দেখবার বিষয় আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এর জন্য কতটুকু প্রস্তুত । সাধারনত কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের মধ্যে ২০ শতাংশের হসপিটালাইজেশন এবং ৫ শতাংশের আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর এর প্রয়োজন হয় । এর অর্থ আগামী ১৫ দিনে দেশে কেবল করোনা আক্রান্ত রোগীর জন্য প্রায় ১৬ হাজার হাসপাতাল বেড এবং ৪ হাজার আইসিইউ কিংবা ভেন্টিলেটর এর প্রয়োজন হবার আশঙ্কা রয়েছে । তার চেয়েও বড় কথা আমরা সঙ্ক্রমণের সর্বোচ্চ সীমা অর্থাৎ পিকের কাছাকাছি এখনো পৌছাই নি, যার অর্থ এই সঙ্খ্যাগুলি ক্রমবর্ধমান । আমরা চাই এই সব মডেল, সব আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হোক, কিন্তু কঠিন বাস্তবতা আমাদের ততটুকু আশাবাদী হতে দেয় না ।

তবে দেরিতে হলেও আবারো হার্ড লকডাউনে যাবার সিদ্ধান্তের কথা আমারা গণমাধ্যমে শুনছি – যার দ্রুত বাস্তবায়ন অপরিহার্য । লকডাউন এ রাষ্ট্রের কোষাগার খালি হয়ে যায়, জীবিকা বিপর্যস্ত হয় – কিন্তু জীবনের বিনাশ যেখানে অতিসম্ভাব্য, সেখানে টিকে থাকাটাই তো একমাত্র লক্ষ্য । সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে একদিনের কালক্ষেপণ হতে পারে অসঙ্খ্য সঙ্ক্রমণের কারণ এবং প্রতি একদিনের বিলম্ব স্বাভাবিকতায় ফিরবার অপেক্ষাকে কমপক্ষে ২.৪ দিন দীর্ঘতর করতে পারে । তাই সঠিক সময়ে সঠিক ও দ্রুততর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই ।

আমরা যত দ্রুততা এবং দক্ষতার সাথে সঙ্ক্রমণের গতি রোধ করতে পারব, তত তাড়াতাড়ি আবার আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরবার আশা করতে পারব । সবচেয়ে বড় কথা আমাদের আছে প্রচন্ড পরিশ্রমী অসঙ্খ্য মানুষ – স্বল্পহারী স্বল্পভাষী স্বল্পদৈর্ঘের সেই সব মানুষের প্রাপ্তির হিসেব না মিললেও বছরের পর বছর ধরে তারাই টিকিয়ে রাখে দেশের অর্থনীতির চাকা । দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে তারাই দিন-রাত এক করে আমাদের দেশটাকেও ফের দাড় করিয়ে দিতে পারবে । আমারা সে আশায় বসে আছি ।

লেখক: মো. মহিবুল হক খান, সিনিয়র পলিসি এনালিস্ট, গভর্নমেন্ট অব আলবার্টা, কানাডা ।

মুহম্মদ রিজওয়ানুর রহমান, ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা,

ডা. শাহরিয়ার মোহাম্মদ রোজেন, সিনিয়র পলিসি লিড, গভর্নমেন্ট অব আলবার্টা, আলবার্টা মিনিস্টড়ি অব হেলথ, কানাডা ।